Saturday, September 6, 2008

খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি

07.09.08
উপসম্পাদকীয়
।। ইত্তেফাক।।
ধীরাজ কুমার নাথ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে মাত্র কয়েকদিন আগে “বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা” শীর্ষক একটি সেমিনার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি ড. ওলাফার র‌্যাগনার গ্রিমসন এই সেমিনারের সমাপনী দিনে বক্তব্য রেখেছেন। এই সেমিনারে পৃথিবীর ১৭টি দেশের প্রায় ২৭০ জন প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এই সম্মেলনটি উদ্বোধন করেন। এ জাতীয় বৃহৎ ও দিক-দর্শনমূলক জ্ঞানগর্ভ একটি সম্মেলন বাংলাদেশে ইতিপূর্বে খুব কমই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাপ্তি দিবসে প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে উল্লেখ করেন যে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি ও জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণ হুমকির মধ্যে পড়েছে”। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, “সমুদ্র স্তরের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা তলিয়ে যাবে এবং আড়াই থেকে তিন কোটি লোক “জলবায়ু উদ্বাস্তু” হিসাবে স্থানচ্যুত হতে উৎপাদনের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে পর্যাপ্ত খাদ্য, বাসস্থান, খাবার পানি ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ৫ কোটি লোককে দারিদ্র্যমুক্ত করার বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাই খাদ্য উৎপাদনের সকল প্রচেষ্টা এবং খাদ্য মজুদের মাধ্যমে নিরাপত্তাবলয় সৃস্টির লক্ষ্যে অধিকতর বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট গ্রিমসন, এই প্রেক্ষাপটে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশসমূহের মধ্যে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি। খাদ্য নিরাপত্তার বলয়, সৃষ্টিতে প্রতি পদক্ষেপে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনকে যেমন বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনিভাবে সামাজিক মূলধন সৃষ্টির সকল প্রচেষ্টাকে অর্থহীন করছে। প্রতিবছর বাজেটের বিশাল অংশ ত্রাণ, পুণর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হচ্ছে। এ জাতীয় বিপদ সঙ্কুল অর্থনীতি, পৃথিবীতে খুবই বিরল। তার উপর আছে, আমাদের দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সব কিছু একীভুত করে বিবেচনা করলে প্রতীয়মান হবে, বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার প্রত্যক্ষভাবে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য সংকট ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত এক বছরে ৪০ লক্ষ লোক চরম দারিদ্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গত ২৬ আগস্ট, ২০০৮ বিশ্বব্যাংক এ তথ্য প্রকাশ করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয় যে ২০০০ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনগোষ্ঠীর ৪৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। গড়ে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করে, ফলে ২০০৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) এর হার ২০০৮ সালেও একই পর্যায়ে রয়েছে বিধায় দরিদ্র মানুষের শতকরা হার ৩৫ শতাংশে নেমে আসার কথা। কিন্তু গত অর্থবছরে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্যতা ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এ হচ্ছে এক দুঃখজনক অধ্যায়। তবে অর্থ উপদেষ্টা-এ তথ্য সমর্থন করেনি।

এ কথা সত্য যে, খাদ্য সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানুষের জীবনে ব্যাপক অস্থিরতার সূচনা করেছে। জনগণ অসন্তুষ্ট, ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে দ্রব্যমূল্য। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, খাদ্যের এ সংকট সরকারকে নিরসন করতেই হবে। এ লক্ষ্যে অতিদ্রুত বিভিন্ন উৎস থেকে ধান চাল গম ডাল সংগ্রহ করে মজুত বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার বলয় সৃষ্টি করতে হবে। তবে অত্যন্ত অর্থবহ হচ্ছে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির সকল উদ্যোগ গ্রহণ, কৃষকদেরকে উচ্চফলনশীল বীজ ও উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তোলা এবং সার ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অধিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করার মতো প্রশিক্ষণ দান করা। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে চালের উৎপাদন কমপক্ষে আরো ২০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। ভিয়েতনাম ও চীনের তুলনায় বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা কমপক্ষে ৩০ শতাংশ কম বলে সমীক্ষায় প্রতিভাত হয়েছে। পক্ষান্তরে, গ্রামীণ জনপদে লাগামহীনভাবে বাড়িঘর নির্মাণ, নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, প্রতিবছর ৩ শতাংশ হারে আবাদি জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে নির্বিচারে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আমাদের কৃষিকে প্রকৃতিও পরিবেশ, জীব ও জীবনের প্রতিপক্ষ হিসাবে উপস্থাপন করেছে। মৃত্তিকা দুষণ, পানি দুষণ, লবণাক্ততা, মরু প্রবণতা ও কৃষিতে বিবিধ অবৈজ্ঞানিক ও অনাচার কৃষি বিজ্ঞানকে উপহাস করছে।

কৃষি হচ্ছে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান। নিত্যনতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, বহুমুখী গবেষণা, টিস্যু কালচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তনের সাথে আমাদেরকে সম্পৃক্ত হতে হবে। উন্নত বীজ আমদানী ও সংরক্ষণ, জৈব সারের প্রয়োগ, বেশি ইউরিয়া ব্যবহার, ড্রীপ ইরিগেশান পদ্ধতি, একই জমিতে বহু ফসল বা কয়েকতলা করে চাষাবাদ, লবণাক্ত পানিতে বিরি ধান-৪৭ এর ব্যবহার ইত্যাদি নানাবিধ প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি শুধু কৃষককে নয় সকল স্তরের জনগণকে কৃষিজ্ঞান দিতে পাঠ্যসূচিতে কৃষিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আরো অধিক কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সরকারের অর্থায়নে ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে পরিচালনা করার এখনই সময়। খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে মোট ৬ কোটি ৩২ লক্ষ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে হলে বর্তমানে চাষযোগ্য জমি ১ কোটি ৫৪ লাখ হেক্টর থেকে অনেক বেশি বৃদ্ধি করতে হবে।

তদুপরি, বর্তমানে প্রচলিত সার নীতি, বীজ নীতি, পানি সেচ নীতি ইত্যাদিকে একীভূত করে সম্মিলিত কৃষি নীতি চালু করাই হবে কৃষি বিপ্লবের সূচনা। পতিত জমি, এক ফসলী জমি, জলা ও হাওর এবং চরাঞ্চলের জমিকে নীবির কৃষির আওতায় আনতে না পারলে, ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার যে লক্ষ্য তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সর্বশেষ হিসাব মতে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষি জমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে মোট কৃষি জমির এক চতুর্থাংশ কমে যাবে। জনসংখ্যা বাড়ছে এবং একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের বিবিধ প্রকার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বাইওফুয়েলের অগ্রযাত্রাকে যেমন থামানো যাবে না, তেমনিভাবে খাদ্যাভাসে অর্থবহ পরিবর্তন আনা বাংলাদেশে সহজ হবে না। এতসত্ত্বেও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের লক্ষ্যে ব্যাপক ভিত্তিক গণসচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। দুধ উৎপাদনকারীরা গ্রামাঞ্চলে মূল্য পায় না, মধু উৎপাদনকারীরা বাজার পায় না, সবজি বিক্রেতা উৎসাহ পায় না, ফল পুষ্প উৎপাদনকারী মধ্যসত্বভোগীদের কাছে থাকে জিম্মি, কৃষকেরা দাদনের ভারে অগ্রিম ফসল বিক্রি করছে, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারীরা কাকডাকা ভোরে বাড়ীর আঙ্গিনায় হানা দিচ্ছে। এ জাতীয় অর্থনীতিতে খাদ্য নিরাপত্তার বেষ্টনী সৃজন মনে হয় অতটা সহজ নয় কিন্তু এগিয়ে চলার পথে থামার কোন সুযোগ নেই। কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে অর্থনীতিকে বাঁচতে হবে। কৃষি প্রশাসক ও বিজ্ঞানী এবং সম্প্রসারণ কর্মীদেরকে কৃষকের দুয়ারে দুয়ারে যেতে হবে। পরিস্থিতি এমন যে অর্থ থাকলেও আমদানী করার সুযোগ থাকবে না। খাদ্য সংকটের আশঙ্কার কথা জানিয়ে আই.এম.এফ বলেছে, খাদ্য সংকটের কারণে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার সম্মুখীন হতে পারে। প্রবৃদ্বির হার ৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে।

কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া অন্যকোন পন্থা আপাতত নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি হেক্টরে ধান উৎপাদন হয় সাড়ে ৩ টন অথচ জাপান, কোরিয়া এবং গণচীনে উৎপাদন হয় ৫ থেকে ৬ টন।

এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টি করা ভিন্ন বিকল্প কোন পন্থা নেই।

[ লেখক সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক

সরকারের সাবেক উপদেষ্টা]

No comments:

About Me

My photo
প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদপত্র কৃষি বিষয়ে নানান সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। এ সকল তথ্য কাজের জন্য খুবই সহায়ক। কিন্তু একজনের পক্ষে প্রতিদিন সবগুলো সংবাদপত্র পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ এ সকল বিষয়গুলো আমাদের সবার জন্য কম-বেশি দরকারি। এ চিন্তা থেকে আমরা বিভিন্ন সংবাদপত্র নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও কৃষি বিষয়ক সংবাদসমূহ তথ্যায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছ্।ি আশা করছি সংবাদ তথ্যায়নের এ প্রকিৃয়াটি আমাদের কাজের জন্য সহায়ক হবে। পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক- প্রান এ কাজটি সঞ্চালনের কাজ করছে।

Krishi Khobor