23.08.08
দেশের উন্নয়নের নিয়ামক কৃষি অর্থনীতি। জ্বালানি তেল ও সারসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে। ফসলি জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস, সার, সেচ ও উন্নত বীজ সংকট, কীটনাশকে ভেজাল, কৃষি জমি কমে যাওয়া ও লবণাক্ততার ছোবলে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়েই প্রতিবন্ধকতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় কৃষি উপকরণ খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধিকরণ। তারা বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর কৃষকের সার কেনার জন্য অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ও ডিজেলে দেড় হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে ও কৃষি অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রতি বছর অন্তত সাড়ে ৩ লাখ টন শস্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষিঋণ বিতরণ পদ্ধতি সহজ করাসহ ভর্তুকি অর্থের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ভূমি সংস্কার, পুনর্বণ্টন ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কৃষি জমি বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামে বাস করা ৮৪ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে প্রান্তিক চাষি পরিবার ৩৮ দশমিক ৬৩ ভাগ, ছোট চাষি পরিবার ৪৯ দশমিক ৬৩ ভাগ, মাঝারি চাষি পরিবার ১০ দশমিক ৩৪ ভাগ, বড় চাষি পরিবার ১ দশমিক ১৭ ভাগ ও প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার ১৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এসব কৃষকের কৃষিই একমাত্র জীবিকার মাধ্যম হলেও তাদের স্বার্থ রক্ষায় নেই কোনো নীতিমালা। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কফিলউদ্দিন আহমেদ বলেন, তীব্র চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের সারের দাম গত ১ বছরে দ্বিগুণ ও ২ বছরে ৫ গুণ বেড়েছে। ভর্তুকির পরিমাণ রয়েছে আগের হারেই। এতে কৃষক-সরকার উভয়েরই ব্যয় বাড়বে। প্রতি টন ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক দাম ২০০১ সালের ডিসেম্বরে ৯৫ ডলার থাকলেও ২০০৬-এ ২০০, ২০০৭-এ ২৫০, ২০০৮-এর জুলাইয়ে ৫০০ ডলার হিসাবে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, প্রতি টন টিএসপি ২০০১-এ ১৫৫, ২০০৬-এ ২১৫, ২০০৭-এ ৬৬০, ২০০৮-এর জুলাইয়ে ১০৬৫ ডলার হিসাবে প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, প্রতি টন ডিএপি ২০০১-এ ১৯০, ২০০৬-এ ৩২৫, ২০০৭-এ ৭০০, ২০০৮-এ ১৩৫০ ডলার হিসাবে ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, প্রতি টন এমওপি ২০০১-এ ১১০, ২০০৬-এ ২৮০, ২০০৭-এ ৫৫০, ২০০৮-এ ১০৫০ ডলার হিসাবে ৮০ হাজার ৮৫০ টাকা (প্রতি টনে পরিবহন খরচ ১০০ ডলার হিসাবে) হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুস সাত্তার ম-ল বলেন, বিশ্ববাজারে কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও ধান-চালের দাম কমতে শুরু করেছে। এভাবে যদি বাংলাদেশে চালের দাম কমে যায় তাহলে গরিব মানুষ উপকৃত হলেও কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সে ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য অতিরিক্ত ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অভিযোগ রয়েছে, গত বছর ডিজেলে যে ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল তা যাদের পাওয়ার কথা ছিল তারা পাননি। তিনি কৃষি অর্থনীতিকে সচল রাখতে সঠিকভাবে কৃষি উপকরণ বণ্টনের কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি কৃষি উপকরণের দাম আরও বাড়তে থাকে তাহলে কৃষক বেকায়দায় পড়বেন। সে ক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সার ও জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষকের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য কৃষি ভর্তুকি বাড়িয়ে সময়মতো সুষ্ঠুভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. জহুরুল করিম বলেন, গত অর্থবছর প্রায় ১৬৮০ কোটি টাকা দামের ২৮ লাখ টন ইউরিয়া এবং ২ হাজার কোটি টাকা দামের ১০ লাখ টন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার কৃষকপর্যায়ে বিক্রি হয়েছে। এ বছর দাম দ্বিগুণ হওয়ায় সমপরিমাণ সার কিনতে কৃষকদের গড়ে অতিরিক্ত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হচ্ছে। এই টাকা কৃষক সংগ্রহ করতে না পারলে কৃষি উপকরণ কিনতে পারবে না। এর ফলে কৃষি অর্থনীতিতে একটা বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ইব্রাহিম খলিল জানান, সার ও বীজসহ কৃষি উপকরণ কৃষকের হাতে তুলে দিতে পারলে কৃষি অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে। তবে সারের বর্তমান চড়া দাম কৃষির জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি উপদেষ্টা ড. সি এস করিম জানান, গত বছর গম, আলু, ভুট্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টন। বীজ, সার, সেচ, মাড়াই, পরিবহন, শ্রমিকসহ আনুষঙ্গিক খরচে প্রতি কেজির দাম ১৮ টাকা পড়লেও কৃষককে দেয়া হয়েছে ২৮ টাকা। শুধু বোরো ধান বিক্রি থেকেই আয় হবে ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি কেজি ১০ টাকা লাভ হিসাবে কৃষক এবার ৫ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা বেষ্টনী পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে সারের দাম অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় ১১ বছর পর ইউরিয়ার দাম দ্বিগুণ করা হয়েছে। এর ফলে শস্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি দাবি করে বলেন, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ইউরিয়া খরচ মাত্র ৮০ পয়সা (আগে ছিল ৪০ পয়সা)। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষির ওপর প্রভাব পড়বে কি না প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, গত বছর সরকার ডিজেলের ভর্তুকি বাবদ ৭০ হাজার কৃষককে ২৫০ কোটি টাকা দিয়েছে। এবার বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৪০ কোটি টাকা।
No comments:
Post a Comment