Sunday, September 7, 2008

কৃষিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে উজিরপুর অর্গানিক বহুমুখী সমবায় সমিতি ।। রাসায়নিক সার-কীটনাশক ছাড়া চাষাবাদ

০৮.০৯.০৮
।।ইত্তেফাক।। তারিকুজ্জামন, নড়াইল সংবাদদাতা

নড়াইল পৌরসভার উজিরপুর অর্গানিক বহুমুখী সমবায় সমিতির জৈব সার কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সদর উপজেলার উজিরপুর গ্রামের কৃষকরা সমিতির মাধ্যমে একত্রিত হয়ে প্রাকৃতিক ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পাওয়ায় আশ-পাশের গ্রামের কৃষকরাও প্রাকৃতিক ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছ্।ে এ সমিতির কর্মকান্ড এখন নড়াইলে একটি আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমিতিভুক্ত কৃষকরা রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে জৈবসার ব্যবহার করছে। শুধু তাই নয় ফসলের পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ফরোমন ট্যাপ পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে এসব পদ্ধতি স্বাস্থ্যসম্মত এবং অধিক লাভজনক বলে বিবেচিত হয়েছে।

জানা গেছে, নড়াইল পৌরসভার উজিরপুর গ্রামে গড়ে ওঠা উজিরপুর অর্গানিক বহুমুখী সমবায় সমিতি ইতিমধ্যে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নিয়ে কৃষকদের সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। প্রকল্পভুক্ত কৃষকরা এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন বলে কৃষকদের কাছে জানা গেছে। উজিরপুর গ্রামের অরবিন্দু বিশ্বাস (৫০) সমিতির মাধ্যমে উন্নত পদ্ধতিতে বেগুন, ওল, ঝিঙা, বরবটি, সীম চাষাবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। গ্রামের মহিদ মিয়াও একই পদ্ধতিতে ধান চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। এছাড়া তরুণ চক্রবর্তী (৫০), নূরুল মন্ডল (৪০), শরীফ মোল্যা (৩৫), আব্দুস নুর (৫৫), রফিকুল মিনা (৪০), হিরুজ্জামান (৩৫) বিভিন্ন প্রকার সবজি যেমন কুশি, ওল, লাউ, পটলের আবাদ করে ভাল ফলন পেয়েছেন। এসকল সবজি চাষী বলেছেন, সমিতির মাধ্যমে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বাদে সবজি চাষ করে তারা ব্যাপক লাভবান হয়েছেন। তাছাড়া বাজারেও এসব সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসএসসি পাস সুফিয়ান বেকার ঘুরে বেড়াতেন। তিনিও সমিতির সদস্য হয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পিঁয়াজ, রসুন, চাষ করে গত বছর ৫০ হাজার টাকা আয় করেছেন। তিনি বর্তমানে ৩ একর জমিতে সবজি চাষ করেছেন। উল্লেখিত কৃষকরা সমিতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে সবজি আবাদের ওপর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর নড়াইল পৌরসভার উজিরপুর গ্রামের কয়েকজন বেকার যুবক ও কৃষকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমবায় ভিত্তিক এ চাষাবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার, রাসায়নিক কীটনাশক ওষুধের পরিবর্তে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ফরোমন ট্যাপ পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়। সমিতির কৃষকরা ২০০৬-০৭ পাট মৌসুমে ৫ একর জমিতে দেশী তোসা জাতের পাটবীজও উৎপাদন করেছে। সমিতির কর্মকর্তা আবুল হক ও খন্দকার শাহেদ আলী শান্ত জানিয়েছেন, তারা ১২ হাজার ৮শ কেজি পাটবীজ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন, যার একটা বড় অংশ সরকারি বীজ বিক্রয়কারী বিএডিসি নড়াইল ও লিলি এন্ড কোম্পানির নিকট বিক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া সমিতি গত বোরো মৌসুমে ১৩৫ একর জমিতে বিআর ১০,১১,২৮,২৯ ও ৪১ জাতের ৫০ টন বীজ ধান উৎপাদন করেছে। যা সমিতির সদস্য কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি বীজ বিএডিসি নড়াইলকে দেয়া হয়েছে। সমিতি চলতি মৌসুমে ১০ একর জমিতে নিজস্ব উৎপাদিত জৈব সারের মাধ্যমে সবজি চাষ করেছে। সমিতি নিজস্ব ১টি বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ার পাম্পের মাধ্যমে ২০০ একর জমিতে বোরো চাষের ব্যবস্থা করেছে। সম্প্রতি আরো ৩টি পাওয়ার পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। আগামী বোরো মৌসুমে ৪টি বৈদ্যুতিক পাওয়ার পাম্পের মাধ্যমে এলাকার ১১ থেকে ১২ শত একর জমিতে বোরো চাষ করবে বলে তারা আশা করছে। এছাড়া তারা এ বছর ৪ একর জমিতে মশলা জাতীয় ফসল বীজ উৎপাদন করেছে। চাষাবাদে বিজ্ঞানভিত্তিক যন্ত্রপাতি ড্রাম-সিডার, মটর চালিত প্রেয়ার, পাওয়ার টিলার ও ড্রায়ার ব্যবহার করছে। সমিতি ইতিমধ্যে ৫০ টন কম্পোস্ট সার উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা আগামীতে জেলার চাহিদা পূরণের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে সার উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া সমিতি মৌঁঁমাছি চাষ প্রকল্পও শুরু করেছে।

সমিতির নারী ও পুরুষ সদস্যরা মেঁৗঁচাষে স্ব-স্ব ভূমিকা রেখে চলেছে। এলাকায় সরেজমিনে গেলে কৃষকরা তাদের সাফল্যের ও স্বপ্নের কথা জানান। ২৫ জন সদস্য নিয়ে সমিতির যাত্রা শুরু হলেও এখন সমিতির সদস্য সংখ্যা নারী-পুরুষ মিলে ১৫০ এ দাঁড়িয়েছে। বিগত পাট মৌসুমে সমিতির বীজ পাটক্ষেত পরিদর্শনে আসেন পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহাফুজউল্লাহ, নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম মন্ডলসহ অন্য আরও অনেকে। এ ব্যাপারে নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক নজরুল ইসলামের সাথে আলাপ করলে তিনি জানান উজিরপুর অর্গানিক বহুমুখী সমবায় সমিতি বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

No comments:

About Me

My photo
প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদপত্র কৃষি বিষয়ে নানান সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। এ সকল তথ্য কাজের জন্য খুবই সহায়ক। কিন্তু একজনের পক্ষে প্রতিদিন সবগুলো সংবাদপত্র পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ এ সকল বিষয়গুলো আমাদের সবার জন্য কম-বেশি দরকারি। এ চিন্তা থেকে আমরা বিভিন্ন সংবাদপত্র নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও কৃষি বিষয়ক সংবাদসমূহ তথ্যায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছ্।ি আশা করছি সংবাদ তথ্যায়নের এ প্রকিৃয়াটি আমাদের কাজের জন্য সহায়ক হবে। পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক- প্রান এ কাজটি সঞ্চালনের কাজ করছে।

Krishi Khobor