Sunday, September 7, 2008

শাক-সবজি চাষ করে দারিদ্র্য ঘুচিয়েছে দক্ষিণ নিয়ামতপুর গ্রামের মানুষ

০৮.০৯.০৮
।। ইত্তেফাক।। সৈয়দ আমিরুজ্জামান, সৈয়দপুর সংবাদদাতা

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রাম দক্ষিণ নিয়ামতপুর। এই গ্রামের বাড়ির আঙ্গিনাসহ পতিত জমিতে মৌসুমী শাক-সবজি, ফলদ ও বনজ বৃক্ষের সমারোহ। কোথাও এক চিলতে জমিও খালি পড়ে নাই।

শুধু বাড়িই নয়, পুরো গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শাক-সবজির বাগান। দূর থেকে দেখে মনে হবে শিল্পীর রং তুলিতে আঁকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। এই গ্রামের মানুষ তাদের শ্রম ও মেধা দিয়ে ঘটিয়েছে সবুজ বিপ্লব। সব শাক-সবজি বেচে তারা তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে হয়েছে স্বাবলম্বী। গ্রামের ১৪০টি পরিবারই অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে ঘুচিয়েছে দারিদ্র্য, ছিন্ন করেছে পরনির্ভরতার বেড়াজাল।

ওই গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় মৃত গাজী মামুদের ছেলে আব্বাস আলীর (৫৫) সঙ্গে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার জমির ভাগ পেয়েছেন মাত্র ১৪ শতক। স্ত্রী, ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। সারাদিন অন্যের ক্ষেতে-খামারে গতর খাটিয়ে যা পেতেন তাই দিয়ে কোন রকমে চলতো তার সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে যেদিন কাজ জুটতো না, সেদিন কাটতো উপোস করে।

আবাদি জমির ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পরামর্শ নিতে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এনামুল হক তাকে বলেন, তার ওই ১৪ শতক জমিতে বিভিন্ন জাতের শস্য আবাদ করে অনায়াসে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। আব্বাস আলী বাড়ি গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে ওই জমিতে শুরু করেন বিভিন্ন জাতের শাক-সবজির আবাদ। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী চাষাবাদ করে তিনি সেই বার ২৫ হাজার টাকা আয় করেন। সেই থেকে তার সাথে গ্রামে অন্য কৃষকদের আস্থা চলে আসে কৃষি কর্মকর্তার উপর।

এরপর ২০০৩ সালে দক্ষিণ নিয়ামতপুর গ্রামের ১৮ জন পরিবার প্রধানকে বেছে নেন সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ। যাদের ২৫ শতক জমিতে আবাদ করার সামর্থ্য আছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উৎসাহি হয়ে তাদের উত্তর-পশ্চিম শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের আওতাভূক্ত করেন। ওই ১৮ জনকে ১মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের নিয়ে গঠন করা হয় একতা পুরুষ দল’। ওই ১৮ জনের ২৫ শতক করে জমি প্রকল্পভূক্ত করে শুরু করা হয় চাষাবাদ। মামুনুর রশিদ, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হোমায়রা মন্ডল রাস্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হকের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে পুরোদমে কাজ শুরু করেন এলাকার মানুষ।

একতা পুরুষ দলের দলনেতা আব্বাস উদ্দিন গত ৩ বছরে ওই ১৪ শতক জমিতে আবাদ করে ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় কিনেছেন ৭৫ শতক জমি। গ্রামের লোকজন প্রয়োজন ছাড়া রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। তাদের নিজেদের তৈরি কম্পোস্ট, গোবর ও সবুজ সার দিয়ে উৎপাদিত ৩৩ জাতের শাক-সবজি মাঠ থেকে তুলে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তারা বিক্রি করেন। তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্য সৈয়দপুর, রংপুর ছাড়াও রাজধানীতে বাজারজাত করা হচ্ছে বলে তারা জানান। একই জমিতে শাক-সবজি আবাদের পাশাপাশি লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ, মসলা ও ঔষুধি গাছ। বিশেষ করে আম্রপালি, পেঁপে, লিচু, আপেল কুল, কলা, আদা-হলুদ, বরবটি, জংলায় পটল চাষ, করলা, মিষ্টি কুমড়া, শসা, লাল শাক, পুঁই শাক, লতিরাজ, পেয়ারা, জাম্বুরা, কলাই। যা বিক্রি করে তারা আয় করছে বাড়তি টাকা। এছাড়া গ্রামের পুকুর ও ছোটখাল পর্যন্ত অকেজো ফেলে রাখা হয়নি। এগুলোতে তারা চাষ করেছেন মাছ। এতে তাদের নিজেদের খাবার-চাহিদাও পূরণ হচ্ছে, পুষ্টিরও ঘাটতি থাকছে না। অনেকে পুকুরে লালন-পালন করছেন হাঁস। এইসব বাজারে হাঁস বিক্রি করছেন তারা। পুরো গ্রাম জুড়ে সবুজের সমারোহ, যেন একটি সাজানো গোছানো বাগান। খয়রাত হোসেনের স্ত্রী রেহানা বেগম গেল বছর তার ২৫ শতক জমিতে পাহাড়ি জাতির আদা এবং ওই আদা ক্ষেতের উপরে জংলা দিয়ে করলা চাষ করে লাভবান হয়েছেন। এবছর সেই জমিতে চাষ করেছেন কচু। গ্রামের মৃত বাছান উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম অতি ঘন পদ্ধতিতে লাগিয়েছেন আম্রপালি। এরই ফাঁকে ফাঁকে চাষ করে আসছেন লাউ, লাল লাক, বেগুনসহ বিভিন্ন জাতের সাথী ফসল।

কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে চাষীদের জমির স্বাস্থ্য রক্ষা করে একই জমিতে অধিক ফসলের সমাহার ঘটানো হয়েছে গ্রামে। সেই সাথে বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে উচ্চ মূল্যের ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকদের বারবার চেষ্টা করা হয়েছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রামে।

দেশের ১৬টি জেলার ৬০টি উপজেলায় দক্ষিণ-পশ্চিম শস্য বহুমুকীকরণ প্রকল্প কাজ করছে। তবে সৈয়দপুরের দক্ষিণ নিয়ামতপুর গ্রামটি বর্তমানে একটি মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রামটি পরিদর্শনে কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এডিবি প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করেছেন এবং এখনো গ্রামটি পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে। এই বিরাট সাফল্যের পিছনে রয়েছে ওই গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা মেধা ও শ্রম। তারা আর্থিক দীনতাকে অনেক পিছনে ফেলে রেখে আজ সাফল্য অর্জন করছে। দক্ষিণ নিয়ামতপুর গ্রামকে অনুসরণ করলে বাংলাদেশ একদিন পরিণত হবে সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা বাংলাদেশ। কোন মানুষকে আর অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হবে না।

No comments:

About Me

My photo
প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদপত্র কৃষি বিষয়ে নানান সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। এ সকল তথ্য কাজের জন্য খুবই সহায়ক। কিন্তু একজনের পক্ষে প্রতিদিন সবগুলো সংবাদপত্র পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ এ সকল বিষয়গুলো আমাদের সবার জন্য কম-বেশি দরকারি। এ চিন্তা থেকে আমরা বিভিন্ন সংবাদপত্র নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও কৃষি বিষয়ক সংবাদসমূহ তথ্যায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছ্।ি আশা করছি সংবাদ তথ্যায়নের এ প্রকিৃয়াটি আমাদের কাজের জন্য সহায়ক হবে। পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক- প্রান এ কাজটি সঞ্চালনের কাজ করছে।

Krishi Khobor